যেসব প্রকৃতিপ্রেমী তুলনামূলক কম খরচে দেশের বাইরে ভ্রমণ করতে আগ্রহী তাদের জন্য আদর্শ পছন্দ হতে পারে মেঘালয়। জীবনের একঘেয়েমি ক্লান্তিকর মুহূর্ত গুলোকে আড়াল করতে ঘুরে আসতে পারেন মেঘ, পাহাড়-পর্বত, ঝর্ণা আর জলপ্রপাতের রাজ্য ভারতের স্কটল্যান্ড খ্যাত মেঘালয়ের শিলং ও পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের এলাকা চেরাপুঞ্জি থেকে। বাংলাদেশ সিলেট সীমান্ত থেকে চেরাপুঞ্জি সোজাসুজি কুড়ি কিলোমিটারেরও কম। বাড়ির পাশেই বিশ্বের বৃষ্টিবহুল এই এলাকা, সেখানে আষাঢ় কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টি উপভোগ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
মেঘালয় হচ্ছে মেঘেদের বাড়ি। কবিদের অনুপ্রেরনার ও চিত্রকরদের ক্যানভাস। বেড়ানোর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় জায়গা। মেঘালয় ছবির মত সুন্দর একটি রাজ্য। ক্যালচার ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, মেঘের সমাবেশ, জীবনের কিছু রঙ্গিন মুহুত্ব কাটানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা। মেঘালয় ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত উত্তর পূর্ব অঞ্চলে অত্যতম একটি সুন্দর রাজ্য। ২১ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে এটিকে রাজ্য হিসাবে ঘোষনা করা হয়। চোখ জুড়ানো পাহাড়ি দৃশ্য আর শীতল আবহাওয়ার কারণে এ রাজ্যের রাজধানী শিলং শহরকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে শহরটির উচ্চতা প্রায় ১,৫০০ মিটার। বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান চেরাপুঞ্জিও মেঘালয়েই অবস্থিত। এ রাজ্যের ভৌগলিক কাঠামো অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, সিকিম ও হিমাচল প্রদেশের মতো। তবে উল্লিখিত তিনটি জায়গার তুলনায় মেঘালয়ে বেড়ানোর খরচ তুলনামূলক অনেক কম। পুরোটাই ঘন সবুজ বনানীতে আচ্ছাদিত এই রাজ্যের নয়নাভিরাম পাহাড়ি দৃশ্য, দৃষ্টিনন্দন লেকসমূহ, নদী অববাহিকা, বিচিত্র প্রজাতির পশুপাখি সবকিছুই এককথায় অসাধারণ।
প্রয়োজনীয় তথ্য:
মেঘালয়ে আপনি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও যেতে পারেন আবার সহায়তা নিতে পারেন নির্ভরযোগ্য কোনো ট্যুর অপারেটরের। দ্বিতীয়টি বেছে নিলে আপনাকে ভিসার আনুষ্ঠানিকতা, যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। যদিও এতে খরচটা একটু বেশি পড়বে তবে আপনার ভ্রমণ হবে অনেক নিরাপদ এবং দক্ষ ট্যুরিস্ট গাইডের সঙ্গও পাবেন। তবে নিজ ব্যবস্থাপনায় গেলে একটু সতর্ক থাকতে হবে। ভালো ইংরেজি জানলে তা খুব কাজে লাগবে কারণ মেঘালয়ে এই ভাষার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। অবশ্য শিলং শহরে অনেক বাংলাভাষী লোকজনও পাবেন। হোটেল ও ড্রাইভার দুটির ক্ষেত্রেই বাঙালি কিংবা নেপালিদের বেছে নেওয়ার এবং খাসিয়াদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। হোটেল রুম এবং ট্যাক্সি রিজার্ভের সময় সুনিপুণভাবে দরদাম করতে ভুলবেন না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাতে বাইরে ঘোরাঘুরি এড়িয়ে চলুন। কারণ রাতের শিলং কিন্তু দিনের মতো নিরাপদ নয়। তামাবিল সীমান্তে যাওয়ার আগেই খেয়াল করে সোনালী ব্যাংকে ভ্রমণ কর পরিশোধ করুন। ডাউকি বাজারে মানি এক্সচেঞ্জ আছে যেগুলো থেকে আপনার যাত্রাপথের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় ভারতীয় রুপির ব্যবস্থা করতে পারবেন।
মেঘালয় ভ্রমণ সম্পর্কে এখানে দুটি ভাগে সব বিষয় আলোচনা করব। একটা হচ্ছে পর্ব-১ (পূর্বপ্রস্তুতি) যা দেশে থেকেই করতে হবে। যেমন পাসপোর্ট, ভিসা, টাকা/ডলার, ভ্রমণসঙ্গী, পোষাক ইত্যাদি। আর একটা হচ্ছে পর্ব-২ (ভ্রমণপর্ব) । এখানে থাকবে যাতায়াত, বর্ডার ইমিগ্রেশন, হোটেল, খাবার, দর্শনীয় স্থান, শপিং, ইন্টারনেট ইত্যাদি। আর সব ভাগেই খরচের একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব আপনাদের সুবিধার্থে।
পর্ব-১ (পূর্বপ্রস্তুতি):
আপনি মেঘালয় ভ্রমণ করবেন বলে মনস্থির করেছেন। এখন আপনাকে মেঘাল ভ্রমণের জন্য রওনা হওয়ার আগে কিছু কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। চলুন জেনে নিই এই ট্যুরের জন্য কি কি লাগবে। আর এগুলো শুধু মেঘালয় ভ্রমণ নয় মোটামুটি সব দেশে ভ্রমণের জন্যই প্রযোজ্য।
• পাসপোর্ট ও ভিসা
• ভ্রমণ কর
• টাকা/ডলার
• ভ্রমনের উপযুক্ত সময়
• ভ্রমণসঙ্গী
• পোষাক
• অন্যান্য
পাসপোর্ট ও ভিসা:
বিদেশ ভ্রমনের জন্য আপনার একটি পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা থাকা আবশ্যক। তাই আপনার যদি পাসপোর্ট না থাকে তাহলে পাসপোর্ট করে নিন। শিলং/মেঘালয় সিলেট দিয়ে যেতে চাইলে ভিসা এপ্লিকেশনের পোর্ট অব এন্ট্রি-এক্সিট অবশ্যই ‘BY ROAD DAWKI’ সিলেক্ট করবেন।
ভ্রমণ কর/ট্রাভেল ট্যাক্স:
বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণ করলে সরকারকে ভ্রমণ কর বা ট্রাভেল ট্যাক্স দিতে হয়। স্থলপথে ভ্রমণ করের পরিমাণ ৫০০ টাকা যা আগে থেকেই বা বর্ডারে সোনালি ব্যাংকের বুথে জমা দিতে হয়। আমার মতে বর্ডারে সময় ও ঝামেলা এড়াতে যাত্রা শুরুর আগেই ভ্রমণ কর দিয়ে দেয়া উচিৎ। ডাউকিতে ভ্রমণ কর নেয়ার কোন সিস্টেম নেই। এখানে আগে কর দিয়ে না গেলে ঝামেলা হয় আর শেষ ব্যবস্থা হিসেবে ১০০-৩০০ টাকা বেশি দিলে ওরা ব্যাবস্থা করে দেয়।
টাকা/ডলার:
আপনার কত খরচ হতে পারে সেই হিসেবে টাকার বিনিময়ে ডলার এনডোর্স করে নিতে হবে। অথবা ডাউকি থেকে টাকার বিনিময়ে রুপি করে নেয়া যায়। আর ডলার নিলে ডাউকি বাজারে খুব কম রেট দেয়। ডলার ভাংগাতে পারবেন শিলং এ স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া অথবা পুলিশ বাজারের মানি এক্সচেঞ্জ থেকে। সবাই একই রকম রেট দেয়। ডলার এক্সচেঞ্জ করলে রশীদ যত্ন করে রাখুন। অনেক সময় ইমিগ্রেশনে দেখতে চাইতে পারে। আর একটা ব্যপার হল, যদি ডলার নেন তাহলে শিলং ছাড়া ভাল রেটে রুপিতে চেঞ্জ করতে পারবেন না। তাই চাইলে দেশে থেকেও কিছু রুপি নিয়ে যেতে পারেন যাতে করে ডলার ভাঙ্গানোর আগ পর্যন্ত খরচ চালিয়ে নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন ইন্ডিয়ান রুপি ইন্ডিয়ার বাইরে নেয়া ও বাইরে থেকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় প্রবেশ করা অবৈধ।
ভ্রমনের উপযুক্ত সময়:
শিলং ও চেরাপুঞ্জির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়। আর একারণেই বর্ষার সিজনই উপযুক্ত সময় মেঘালয়ে বেড়াতে যাওয়ার। তাই মে থেকে অক্টোবরই ভাল সময়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এখানে প্রচুর শীত পড়ে (৫-১৫ ডিগ্রী মাত্র)। এখন আপনি আপনার সুবিধামত সময় বেছে নিন।
ভ্রমণসঙ্গী:
ভারতের যেকোন জায়গায় বা দেশেও যেখানেই যাননা কেন সব জায়গায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ভ্রমণসঙ্গী নির্বাচন করা খুবই জরুরি। আর সংখ্যা নির্বাচন করতে হয় উক্ত জায়গায় প্রাপ্ত গাড়ির উপর নির্ভর করে। মেঘালয়ে সাধারণত ছোট ট্যাক্সি (মারুতি সুজুকি) পাওয়া যায় যাতে ৪ জন বসা যায় আরামে। আর ৬ থেকে ১০ জনের জন্য আছে বড় জিপ গাড়ি (টাটা সুমো)। তাই আপনি খরচ কমাতে এভাবে ভ্রমণসঙ্গী ঠিক করুন।
পোষাক:
ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত পোষাক নির্বাচন করা খুবই জরুরি। তবে একটা জিনিস মনে রাখবেন এখানে আপনি বেড়াতে যাচ্ছেন না যে প্রতিদিনের জন্য ভাল ভাল পোষাক নিতে হবে। এখানে আপনি ঘুরতে যাচ্ছেন তাই, ভাল দেখতে পোষাকের চেয়ে আরামদায়ক ও ব্যাগে কম জায়গা লাগবে এমন পোষাক নিন। আর যথাসম্ভব ব্যাগপ্যাক ছোট রাখুন। এখন দেখে নিন কি কি বিষয় খেয়াল রাখবেন। মেঘালয়ে খুব বৃষ্টি হয়। তাই অবশ্যই রেইনকোট আর ছাতা নিয়ে নিবেন।
স্পোর্টস জুতা নিতে পারেন। ভাল গ্রীপ আছে এমন ট্র্যাভেলিং/ট্রেকিং সু নিন। কারণ বেশিরভাগ ঝর্ণা ও লিভিং রুট ব্রিজগুলো দেখতে আপনাকে পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হবে। এছাড়া এগুলোতে পানি ধরে না এবং দ্রুত শুকিয়ে যায়।ওখানে জুতা বৃষ্টিতে ও ঝর্ণার পানিতে ভিজবে। ওরা নিজেরা সবসময় জুতা পরে।
হালকা শীতের কাপড় নিবেন। রাতে অনেক শীত পরে। আপনি যখন যাবেন তখনকার তাপমাত্রা গুগল করে জেনে নিন ও সেইমত শীতের কাপড় নিন। মাফলার নিতে পারেন কারণ, শরীরে শীত না লাগলেও অনেক সময় সেখানে বাতাস খুব ঠান্ডা হওয়ার গলায় ও কানে শীত লাগবে।
আপনাকে দুই/তিনদিন ভিজতে হতে পারে। মানে উমগট নদী, ক্রাংসুরি ফল ও ডাবল ডেকার রুট ব্রিজে গোসল করতে পারবেন। তাই সেইমত গোসলের পোষাক নিন। এমন পোষাক নিন যেগুলো দ্রুত শুকায়।
প্যান্ট ও হাফ/থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট গুলো যদি প্যারাসুট কাপড়ের নিতে পারেন তাহলে সবচেয়ে ভাল হয়। কারণ এগুলো দ্রুত শুকায় ও ব্যাগে কম জায়গা লাগে।
অন্যান্য:
এছাড়া আরো কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিৎ।
পাসপোর্ট এর ডাটা পেইজ ও ভিসার কয়েকটা ফটোকপি দেশ থেকেই নিয়ে যান। হোটেল বুকিং বা সিম কেনায় কাজে লাগবে
চাইলে কয়েক কপি ছবিও নিতে পারেন। যদিও কোথাও লাগবে না। মোবাইলে সম্পুর্ন মেঘালয়ের ম্যাপ অফলাইনে ডাউনলোড করে নিন। এতে আপনি ইন্টারনেট ছাড়াই শুধুমাত্র জিপিএস ব্যাবহার করে করে জায়গাগুলোতে চলাচল করতে পারবেন।
প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ নিতে পারেন। যেমন প্যারাসিটামল,মেট্রোনিডাজল, এসিডিটির যেকোন ওষুধ। ত্বক সচেতন হলে ক্যাপ, হ্যাট বা সানস্ক্রিন। খাবারের স্বাদ আপনার পছন্দ নাও হতে পারে, তাই সেরকম মানুষিক প্রস্ততি নিয়ে রাখুন। এক্সট্রা ব্যাটারি বা পাওয়ার ব্যাংক ও নিয়ে যেতে পারেন।
পর্ব-২ (ভ্রমণপর্ব):
বাংলাদেশে থাকতেই ইন্টারনেটে শিলংয়ের কোনো হোটেলে অগ্রিম বুকিং দিলে খুবই ভালো হবে। তুলনামূলক সস্তা হোটেলগুলো নগরীর প্রাণকেন্দ্র পুলিশ বাজারে অবস্থিত। আপনার সাথে থাকা ইউএস ডলার ভাঙিয়ে ভারতীয় রুপি করার ব্যাপারে হোটেল রিসেপশনের সাহায্য চাইতে পারেন। অনেক হোটেলেই আছে তুলনামূলক কম খরচে শহরের আকর্ষণীয় স্থানগুলো দেখানোর জন্য প্যাকেজ ট্যুরের সুবিধা। আসুন জেনে নেই মেঘালয়/শিলং এর দর্শনীয় স্থানগুলো কোনগুলো। এখানে জায়গাগুলো এক এক দিনের প্যাকেজ হিসেবে দেয়া হল। আপনি আপানার মত সাজিয়ে নিতে পারেন আপনার প্ল্যান অনুযায়ী।
দিন ১ (ডাউকি):
নোহওয়েট লিভিং রুট ব্রিজ
মাউলিলং ভিলেজ
বোরহিল ঝর্ণা
উমক্রেম ঝর্ণা
স্নোনেংপেডেং ভিলেজ
উমগট রিভার
দিন ২ (ডাউকি):
ক্রাংসুরি ঝর্ণা
চেরাপুঞ্জি গমণ
দিন ৩ (চেরাপুঞ্জি)
ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ
মৌসিমাই কেভ
সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা
ইকো পার্ক
নুকায়কালী ফলস
দিন ৪ (শিলং শহর):
শিলং পিক
লেডি হায়াদ্রি পার্ক
ডন বস্কো মিউজিয়াম
উমিয়াম লেক
ক্যাথিড্রাল চার্চ
গলফ কোর্স
ওয়ার্ডস লেক
৫ম দিন (শিলং-ঢাকা):
সকালে নাস্তা শেষে শিলং থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা করুন। ডাউকি বর্ডারে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করে রাতে সিলেটের কোনো এক রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষ করে বাসে/ট্রেনে ঢাকা ফিরে চলুন। এদিন আসার সময় এলিফেন্ট ফলস দেখে আসুন। তা না চাইলে আগের দিনই এটা দেখে নিতে পারেন। কিন্তু ডাউকি বর্ডারে ফিরে আসার পথে এইটা পড়ে।
সর্বাধিক দর্শনীয় পর্যটন স্থান গুলোর বিবরণ:
শিলং পিক ও সোহপেতবিনেং পিক:
এই দুটি উঁচু জায়গা শিলং শহর থেকে যথাক্রমে ১০ কিলোমিটার ও ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শিলং পিক হচ্ছে সারা মেঘালয় রাজ্যের উচ্চতম জায়গা যা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১,৯৬১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ঘন সবুজ বনানী সৌন্দর্য বাড়িয়ে একে একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। পাখির চোখে গোটা শিলং শহরকে দেখতে পারবেন এখান থেকে। মন চাইবে পুরো দিনটাই এখানে কাটিয়ে দিতে। সোহপেতবিনেং পিকের উচ্চতা ১,৩৪৩ মিটার। খাসিয়া, জৈন্তিয়া, ভই প্রভৃতি সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি তীর্থস্থান।
চেরাপুঞ্জি:চেরাপুঞ্জির অবস্থান শিলং শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত চেরাপুঞ্জি বিশ্বের সবচেয়ে আর্দ্র স্থান হিসেবে পরিচিত। এক বছরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের হিসেবে চেরাপুঞ্জি ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে’ অন্তর্ভুক্ত। দারুণ সব উপত্যকা ও নদী চেরাপুঞ্জির সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। সারা বছরই ভ্রমণ করা যায় জায়গাটিতে। শিলং থেকে কার অথবা পাবলিক বাসে করে সকালে চেরাপুঞ্জি গিয়ে আবার বিকেলে ফেরা সম্ভব। আর যদি সব আকর্ষণীয় জায়গা খুব ভালোভাবে ঘুরে দেখতে চান তাহলে একরাত থাকতে পারেন। চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট, কনিফেরাস রিসোর্ট, পলো অর্কিড রিসোর্ট, সোহরা প্লাজা, হালারি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড লজিং প্রভৃতি সদা প্রস্তুত আপনাকে উষ্ণ আতিথেয়তা দিতে।
কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে সিলেট, সেখান থেকে বাসে কিংবা সিএনজি স্কুটারে তামাবিল। ভারতের পাহাড়গুলোর ঠিক পাদদেশে বাংলাদেশের এই প্রান্তে সমতলভূমিতে ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিস।
সীমান্ত পার হলেই জায়গাটার নাম ডাউকি। ইমিগ্রেশন-কাস্টমের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ভাড়া করতে হবে ট্যাক্সি। শুরুতে শিলং যাওয়াই ভালো। শিলং শহর আর তার আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে বেড়িয়ে তারপর সেখান থেকেই এক দিনের জন্য চেরাপুঞ্জি ঘুরে আসা যাবে।
আর যারা শুধু চেরাপুঞ্জি যেতে চান, তারা ডাউকি থেকেই ট্যাক্সি ভাড়া করবেন চেরাপুঞ্জিতে। তবে সেখানে থাকার মতো বেশি হোটেল এখনও গড়ে ওঠেনি, ফলে আগে থেকে হোটেল বুকিং না থাকলে বিপাকে পড়ে শিলং চলে যেতে হতে পারে। শিলংয়ে ভালো মানের হোটেলের ভাড়া ১৫০০-২০০০ রুপি/দিন।
শিলং শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি থাকার জন্য চমত্কার একটি ব্যবস্থা আছে, নাম চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট। এটিও আগে থেকে বুকিং দিয়ে যেতে হবে।
পাহাড়ের নির্জনে এই রিসোর্টের আশপাশেও রয়েছে ভ্রমণের অনেকগুলো জায়গা। শিলংয়ে হোটেলে বসেই আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোয় বেড়ানোর জন্য হরেকরকম প্যাকেজ পাবেন। এ ছাড়া চেরাপুঞ্জি বেড়ানোর প্যাকেজও পাবেন এখান থেকেই।
পরিবহন:
ভাড়া করা ট্যাক্সিই শিলং ও চেরাপুঞ্জিতে বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো বাহন। তবে বড় দল হলে শিলং থেকে বাস ভাড়া করেও চেরাপুঞ্জি বেড়িয়ে আসা যায়। যারা অহরহ কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকায় বেড়াতে যান তাদের জন্য বলে রাখি, শিলং বা চেরাপুঞ্জিতে থাকা, খাওয়া এবং গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর খরচটা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে কিছুটা বেশি। তামাবিল সীমান্তে ট্রাভেল ট্যাক্স দেওয়ার মতো ব্যাংক নেই, এ জন্য বেশ খানিকটা দূরে যেতে হতে পারে। তাই ঢাকা থেকেই ট্রাভেল ট্যাক্স পরিশোধ করে যাওয়া ভালো।
এ ছাড়া সীমান্ত পার হওয়ার পর বেনাপোল কিংবা চেংড়াবান্ধার মতো মুদ্রা বিনিময়ের সুযোগও খুব সীমিত। এমনকি শিলংয়ের মতো শহরেও ডলার ভাঙানো সহজ নয়, টাকা ভাঙানো প্রায় অসম্ভব। তাই প্রাথমিক ঘোরাফেরার জন্য যতদূর সম্ভব সীমান্ত এলাকাতেই বেশ কিছু ডলার ভাঙিয়ে নিন। এরপর শিলংয়ে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে ডলার ভাঙাতে হবে।
আবহাওয়া:
শিলংয়ে সারাবছর মনোরম আবহাওয়া মেলে। তবে মার্চ ও জুন মাস বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ মরসুম। গ্রীেষ্ম হাল্কা উলের পোশাক ও শীতে ভারি গরমজামার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বৃষ্টিপাত এ অঞ্চলে যখন-তখনই হতে পারে। তাই, ছাতা আর বর্ষাতির বেন্দাবস্তও রাখা চাই।
মেলা-পার্বণ:
এই অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতির বাস, তাই উৎসবেরও আধিক্য। খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরা মহা সমারোহে পালন করেন বড়দিন, গুড ফ্রাইডে, ইস্টার, ইত্যাদি। ইংরেজি নব বর্ষেও আনন্দমুখর হয়ে ওঠেন পাহাড়িরা। খাসি উপজাতির মানুষ পালন করেন শাদ সুকমিনসিয়েম পরব। কা পমব্ল্যাং নংক্রেম অথবা নংক্রেম নৃত্যও অতি প্রসিদ্ধ খাসি উৎসব। জয়ন্তীয়া উপজাতীয়দের পার্বণ বেহদিয়েংখ্লাম পালিত হয় প্রতি বছর জুলাই মাসে। গারোরা পালন করেন ওয়াংগালা উৎসব যা আদতে সূর্যের উপাসনা।
ভোজন:
শিলংয়ে খাবার জায়গা দেদার। রকমফেরও অঢেল। বার্গার, পিৎজা, মিল্কশেক, স্যাণ্ডউইচের দোকান রাস্তার মোড়ে হামেশাই পাওয়া যায়। চীনে খাবার ও তিব্বতি মোমো-থুকপাও পাওয়া যায় বেশ কিছু রেস্তরায়। স্থানীয় খাবারের দোকান তেমন না থাকায় খোজ নিতে পারেন ট্যুরিস্ট লজের ক্যান্টিনে। মনে রাখা দরকার, ভারতের এই অংশে সাধারণত আমিষ খাদ্যের প্রচলন আছে। নিরামিষ খাবারের সন্ধান পাওয়া যাবে মারওয়াড়ি ভোজনালয়ে ও শিলংয়ের কিছু বাঙালি রেস্তরায়।
কেনাকাটা:বেড়ানো শেষে কেনাকাটা করতে হলে শিলংয়ের পুলিশ বাজারের দোকানগুলোয় যাওয়া যায়। এখানে দরদাম করাটাই দস্তুর। এ ছাড়া শহরে আছে বেশ কিছু অত্যাধুনিক শপিং মল। স্থানীয় উপজাতির মানুষের হাতে তৈরি জিনিসপত্রের সম্ভার পাওয়া যায় এখানে।
ভ্রমণ খরচ:
৮-১০ জনের দল হলে মাথাপিছু আনুমানিক ১২০০০ থেকে ১৫০০০ হাজার টাকায় রিলাক্স মুডে সুন্দর একটা ট্যুর দিয়ে আসতে পারবেন।